Monday, July 25, 2016

চলো চাঁদ দেখি


বাবাঃ ঈশান? রাত কয়টা বাজে আর তোকে কয়টা পর্যন্ত পড়তে বলছি?
ঈশানঃ কালকে তো শুক্রবার তাই আজ একটু পরছি। আর একটা পড়া মুখস্ত হলে আর পড়তে ইচ্ছা হয়না।
-তোর জা অবস্থা তোকে বড়ো হয়ে রিক্সা চালাতে হবে বুজলি ?
-আরে আমি গেমস ডেভলপার হব বলসি হয়েই ছাড়বো।
পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে তোর গায়ের হাড়, মাংস আর ছাল ৩ জায়গায় থাকবে বলে দিলাম।
পরীক্ষার রেজাল্টের সময়ঃ
-এখন বল তোকে কি করা উচিৎ? খুব তো লাফালাফি করছিলি যে পরিক্ষা ভালো হবে।, হারামজাদা এই তোর ভালো পরীক্ষা? ৩.৫০ পাইছিস । আর সে নাকি গেমস ডেভলপার হবে!
-অংক, কম্পিউটার এ তো এ+ ই পাইছি।
-তোকে ডাবের সাথে ঝুলিয়ে পিটাতে হবে।
-ধ্যাত! ভাল্লাগে না খালি বক কেন ঘোড়ার ডিম
-তোকে আর কিচ্ছু বলব না। যা খুশী কর।

বিকাল ৪ টায় বাবলীর ফোন...
ঈশানঃ হ্যা বাবলী বল। তোর রেজাল্ট কি?
বাবলীঃ আমি তো প্রতিবারের মতই GPA-5 পাইলাম। তুই নিশ্চই ৩.৫০ এর উপরে পাস নাই
ঈশানঃ একদম কানায় কানায় এটাই পাইছি।
-তো আঙ্কেল নিশ্চই আদর করছে খুব?
-সে তো করবেই। তার একটা মাত্র ছেলে না আমি?
-ভালই করছে... তরে আরো বকা উচিৎ মাই উলু লুলু বেস্ট ফ্রেন্ড। সারা দিন রাত গেমস খেলার পরেও যে তুই পরিক্ষায় এ- পাস এটা তো তোর জন্য সৌভাগ্য।
-দোস্ত রেয়েলী খুব বকছে।
-আচ্ছা তুই ভালো করে পরালেখা করতে পারিস না?
- একটু ও মন চায় না দোস্ত। পড়তে লাগ্লে বইয়ের উপ্রে দেখি আমার Lamborghini Gallardo চালাচ্ছি
-ওরে তুই বিষ খা আমি মইরা যাই
-ধুর! এর আগের ৪ তা জিএফ আমার লগে ব্রেকাপ করছে । এইবার ভাবছি যে মাইয়া গেম খেলে তারে বিয়া করমু।
-এমন মাইয়া কই পাবি বাংলাদেশে ?
-তুই ই তো আছিস। তোকেই কইরালামু টেনশন নিস না আচ্ছা তুই এক কাজ করতে পারিস।
-কি?
-আমার জন্য এখন থেকে ভালো করে লেখাপড়া করতে পারবি না?
-আহারে !!! মনে হয় যে আমি ভালো করে পরলে তুই আমারে বিয়া করবি?
-চাঞ্চ পাইলে মিস করবো না
-লেখাপড়া করে আমি কি কাটবো ? ঘোড়ার ঘাস না ছাগলের ঘাস?
-আমি বলছি তুই করবি ব্যাস... জাস্ট প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে পরবি...
-যদিও সারাজিবনেও সব মিলিয়ে ২ ঘণ্টা পরি নাই তবে তুই যখন বলছিস আমি পরবো কিন্তু আমার সাথে রোজ মালটিপ্লেয়ার এ গেম খেলতে হবে... রাজি?
-ওকে ডান

কঠোর পরিশ্রম করার পরে কেটে গেছে ১ বছর ৬ মাস । টেস্ট এর রেজাল্ট দিয়েছে ঈশানের। বাবাকে ১ বছর ৬ মাস পরে নিজে থেকে রেজাল্ট দেখাতে নিয়ে এসেছে ঈশান।
ঈশান- বাবা আমার রেজাল্ট।
বাবা-বাব্বা কি মনে করে রেজাল্ট দেখাতে নিয়ে আসলি? ফেইল করেছিস?
-দেখ কি করেছি।
-দে দেখি
....................................................................
-৪.৫০??? এতো ভালো কিভাবে করলি? তুই তো কোনদিন ২.০০ ই পাসনি :/
-বাবলীর জন্য পেয়েছি।
-ও তাহলে এই হলো বাবলীর সারপ্রাইজ? কিন্তু তোর ভাগ্যে কখনও A+ জুটবেনা...
-দেখে নিও বাবা A+ পাবো...
-হ্যা সে আমার জানা আছে। যা ভাগ।

বাবলীর ফোনঃ
ঈশান- হ্যালো দোস্ত?
- হ্যা বল বাবা কি বলল?
-বাবা খুশিনা... আমাকে নাকি ৫.০০ পেতে হবে !!! হুহ !!!
-আরে না উনি কখনও খুশি না হয়ে পারবেন না ! উনি আরালে খুশিই হয়েছেন।
-তাই?
-হ্যা। শোন আজকে থেকে তোর পড়ালেখা অনেক বেশি।আজ থেকে তোকে অনেক খাটাখাটি করতে হবে...
- আমি ভাবসিলাম যে তুই এই কথাই বলবি আমাকে।
-হ্যা। এখন থেকে রোজ ৭-৮ ঘণ্টা করে পড়বি...
-এতো?
- হ্যা এতো।
- ওরে শালা!
- ওই তোরে পড়তে বলছি পড়বি ব্যাস। ( চিৎকার করে)
-ওই আমি পড়বো সমস্যা নাই পড়বো।। এতো জোরে ধমক দিস কেনো ভয় লাগে তো
-যাক তাহলে পড়বি?
- অনেক পড়বো আমাকে যে তোর থেকেও ভালো রেজাল্ট করতে হবে রে...হাজার হলেও তোকে তো বউ বানাতে হবে তাইনা?
-উমমমমমম...... সখ কত্ত পোলার দেখ
-আচ্ছা আমি কি পারবো?
- হ্যা তুই পারবি। আমার ঈশান পারবে আমি জানি।
-তোর ঈশান মানে?
- না মানে তুই ই তো আমার এক মাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড ।
- হ্যা সেতাই।। ওকে আমি পারবো।
-এইতো বাবু গুড
-ওকে টাটা।
-টাটা।

এইস.এস.সি পরীক্ষা শেষ। বিকালে বাবলীর সাথে ঈশান ঘুরছে।
ঈশানঃ দোস্ত আজকে রাত্রে ৯.৩০ এ তোদের ছাদে আসিস। আগে ফোন এ কথা বলতাম আর চাঁদ দেখতাম, কিন্তু আজকে একসাথে দেখবো...
-তাই নাকি? ওকে আসবো। দেখাই যাবে হা হা ।
-চল ফুস্কা খাই। ট্রিট আমি দিবো।
- তুই দিবি চল তাড়াতাড়ি,আজকে ৩ প্লেট ফুস্কা খাবো।
- তোর যে পেটের সাইজ ওখানে ৩ তাই তো আটবে না আবার ৩ প্লেট?
- অই কুত্তা নজর দিবি না বলে দিলাম চোখ উপ্রে ফেলব
- হ্যা হইছে এখন চলেন।
- হুম

রাত ৯.৩০ বাবলি ছাদে আসলো পিছন থেকে হাত টেনে নিয়ে ধরলো ঈশান। বড়ো রকমের ভয় পেয়ে গেছে বাবলী।
বাবলীঃ এই তু তু তু তু তু তুই ছাদে কেমনে আইলি ?
ঈশানঃ ঐযে নারিকেল গাছ ওটা বেয়ে এসেছি।
-তোর বাসা তো ১ কিমি দূরে... আন্টি আসতে দিলো?
-নাহ আজ বাসায় বুয়া ছাড়া কেউ নাই। বাবা মা সবাই নানু বাসায়। পরশু আসবে।
-তাই আমি চলে এলাম।
-অনেক ভয় পেয়ে গেছিলাম দোস্ত ।
- আচ্ছা তুই জখন বিয়ে করবি তখন তুই তো তোর বউ কে বাবলি ডাকবি।
-হয়তো :( তুই তো সব এ জানিস যে বাবলী আমার সম্পূর্ণ মনের কল্পনার মেয়ে। যাকে কোনোদিন দেখিনি স্পর্শ করি নি কিছুই না... শুধু তাকে অনুভব করেছি আমার নিজের মধ্যে।
-হ্যা কিন্তু আমাকে তুই বাবলি বলে ডাকিস কেন? আমার তো নিজের একটা নাম আছে।
-তোর যে নিজের একটা নাম আছে সেটা তোকে বাবলি ডাকতে ডাকতে ভুলেই গেছি।
- এখন থেকে হয় আমাকে মৌ বলে ডাকবি না হলে শশী বলে ডাকবি।
-ধ্যাত!!! পারবো না
-কেনো?
-শুনতে চাস কেনো?
-হুম।
-আমাদের দেখা হয়েছিলো গত ৪ বছর ৬ মাস ২১ দিন আগে। তখন সবে মাত্র ক্লাস ৯ এ ভর্তি হয়েছিলাম। একটা একা একটা নিঃশব্দ বালক। যে কোনদিন স্বাধীনতা পায়নি তার জীবনে। বাবার আদর পায়নি কোনদিন। মা ই শুধু একটু দেখে দেখে রেখেছে। একটা মৃত মানুষ আর তখনকার ঈশানের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিলো না। তুই আমার জীবনে আসার পরে আমার মাঝে যা এসেছে তা আর কেউ দিতে পারতো না শুধু তুই আমাকে দিয়েছিস। আমি তোকে ছেরে কিভাবে আরেকটা মেয়েকে নিয়ে সারাজীবন কাটাবো বল? কিভাবে ভাবলি তুই যে তোর জায়গাটা আমি অন্য কাউকে দিবো । বাবলি যে শুধু বাবলি। এর কোন তুলনা নেই... এই অধিকারটা এক মাত্র তোর।
- তুই এসব কি বলছিস?
- আমি ঠিকই বলছি।
-আমি তো কিছুই বুজতেছিনা যে কি বুঝাতে চাইছিস তুই?
-বাবলি?
-হ্যা বল।
-আমি সারাজীবন শুধু আমার বাবলীকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। সেই অধিকারটা তোকে অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছি। তুই সেটা নিবিনা?
-চোখ মুছে ফেলতো।
- হুম।
-এবার আয় চাঁদ দেখি।
-হুম। আমি যে চাই আমার বাবলীকে নিয়ে রোজ এভাবে চাঁদ দেখতে।
-বাবলী তো তোর পাশেই আছে।
-তুই তো মৌ।
-আজ থেকে আমি তোর বাবলী।
-সত্যি!!!
-হুম।
-তাহলে কাধে মাথা রেখে চাঁদ দেখি?
-সারাজীবন যদি দেখতে চাস তাহলে সুযোগটা দিতে পারি।
-হুম সারাজীবন রাখবো।
-এখন চাঁদ দেখি আসো।
-চলো চাঁদ দেখি।

Thursday, July 21, 2016

বিষাক্ত ভালোবাসা - আর রাফিউ খান ঈশান

ফিরে এসেছ তোমার মনে নিয়ে বিষাক্ত ভালোবাসা,
যা চাইনা এই ক্লান্ত জীবনে।
অন্ধ আলোয় সন্ধি পায়ে যেদিন এসেছিলাম এই ঘরে,
সেদিন ভালোবাসার রক্ত ঝরিয়েছিলাম তোমার তলদেশ জুড়ে।
সেই রক্তের দাগ আজো লেগে আছে চাদরের মাঝে,
কতো ঢেউ ঝরিয়েছিলে তুমি তালে মিলিয়ে তাল তোমার,
কতো চিৎকারে ভরিয়েছিলে ঘর আমার।

তারপর হঠাৎ অর্থ-অপূর্ণ তিন বছর পরে,
বেশ্যা হয়ে এসেছিলে ফিরে আবার নতুন করে।
সেই বিচ্ছেদের কাগজে আজো নেই এ হাতের স্বাক্ষর,
কারন তুমি নিতান্তই তখনকার ভুলে ভরা ভালোবাসা আমার।
ফিরে আসবে ভালো হয়ে নতুন করে এই আকাঙ্ক্ষায়,
কতো ঘৃণা ঝরিয়েছি তোমার জন্য আমার দুটি লোচন থেকে।
কতো রাত্রি কাটিয়েছি ওই নিঃস্ব চাঁদের দিকে তাকিয়ে,
সেও নিভে যেতো আমাবস্যার রাতে, হয়ে যেতাম একাকী।

তুমি কি ভেবেছ?
তোমার মতো মিথ্যাবাদীকে আবার ফিরিয়ে নিবো আমি?
এই আমি?
আমার মাথায় কি ভরে আছে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মতো হাজার কাহিনী
যে ভুলে ধরাবে তুমি ঘুণ আমার কাঠের মাঝে
আর আমি টের ও পাবোনা খুন-অক্ষরেও ?
তুমি নিকৃষ্ট,ধূর্ত,প্রতারক,আসামী
আর ভেবেছ এসবের পরেও তোমায় নিয়ে প্রার্থনা করব আমি?

পাগল পাওনি আমায় অই লম্পটদের মতো
যারা খুবলে খেয়েছে তোমার শরীর,পিছনেও হেসেছিলো তোমার।
আর আমি চেয়ে ছিলাম শুধু ভালবাসতে
তার বদলে পেয়েছি শুধুই তাচ্ছিল্য।
এখন আমার পিছনে তোমার মতো
হাজারটা মাগী ঘুরবে যদি পকেটটা একবার খুলি।

তুমি লোভী,
তুমি অন্ধ অন্ধই রয়ে গেলে সারাজীবন।
থামবে না তোমায় নিয়ে লেখা আমার
এতো সবে শুরু।
আমাকে হাজার প্রার্থনাতেও আর খুজে পাবে না তুমি,
কারণ তোমার জন্য আমার ভালোবাসা এখন বিষাক্ত।

Saturday, July 16, 2016

ফিরে পাওয়া ভালবাসা



- এই যে মিস্টার ! আপনি কি চোখে দেখেন না ?
-
কি হয়েছে
- নিচের দিকে তাকান !
 
নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার এক পা কাদার মধ্যে আর সেই কাদা ছিঁটে মেয়েটার ড্রেস ময়লা করে দিয়েছে । বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটার সময় কখন যে কাদার মধ্যে পা দিয়ে দিয়েছি খেয়াল করি নি । মাথা তুলে তাকালাম মেয়েটার দিকে । একটা ভেংচি দিয়ে মেয়েটা চলে গেল , একবার স্যরি বলার সুযোগ ও পেলাম না ! এভাবেই মেয়েটার সাথে আমার প্রথম দেখা ফার্মগেটের এক ব্যস্ত রাস্তায় ...
 
ভার্সিটি ভর্তি কোচিং এর প্রথম ক্লাস ছিল সেদিন এই ঘটনার পর বন্ধুদেরকে বিদায় বলে কোচিং করতে গেলাম । ক্লাসে ঢুকে দেখি টিচার ভাইয়া এসে পড়েছেন আর প্রত্যেকটা বেঞ্চ পূর্ণ । ভাইয়া আমাকে একদম পিছনের একটা বেঞ্চে যেতে বললেন যেখানে শুধুমাত্র একটা মেয়ে বসা ছিল । পিছনে গিয়ে বসতে যাব তখন দেখি এই মেয়েটা হল সেই মেয়েটা যার ড্রেস একটু আগে আমি ময়লা করে দিয়েছি ! একবার মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েই চুপচাপ বসে পড়লাম ।
ভাইয়া ক্লাসের শুরুতে নিজের পরিচয় দিলেন আর এর পর একে একে সবার নাম জিজ্ঞাসা করলেন আর এভাবেই আমি জানতে পারলাম যে মেয়েটার নাম অহনা । ক্লাস শুরু করলেন ভাইয়া , ম্যাথ ক্লাস ছিল সেদিন । খাতায় নোট করছি এমন সময় অহনার দিকে তাকিয়ে বললাম ,
 
- একটু আগের ঘটনার জন্য স্যরি
-
ব্যাপার নাহ্ ! আমি ও স্যরি
-
আপনি কেন স্যরি বলছেন ?
-
খারাপ ব্যবহার করার কারণে
-
নাহ্ , দোষটা তো আমার
-
ঐ বিষয় বাদ ! আপনি তাহলে রাফিন ?
-
হ্যাঁ , আর আপনি অহনা ?
-
হ্যাঁ , পরিচিত হয়ে ভাল লাগলো
-
আমার ও ভাল লাগলো
 
এভাবেই অহনার সাথে আমার পরিচয় নিছক এক দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে .....
অহনার সাথে পরিচয়টা খুব ভালভাবেই হয়েছিল যার কারণে প্রতি ক্লাসেই একটা মিষ্টি হাসি বিনিময় হত আর সামান্য কথাবার্তা । সামান্য কি আর সামান্য থাকে ? তার স্বভাব হল ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া । এভাবেই আমাদের কথা বলার হারও বৃদ্ধি পেতে থাকলো তবে তা শুধুমাত্র পড়ালেখার বিষয়ে অন্য কোন বিষয় নয় । একজন আরেকজনকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে ভালোই চলছিল সময়ের বয়ে চলা ।
একসময় পড়ালেখার সীমানা ছাপিয়ে পারিপার্শ্বিক কথাবার্তা ও শুরু হল আমাদের । ফোন নাম্বার ও বিনিময় হল দুইজনের মধ্যে । কোচিং না থাকার দিনগুলোতে ফোনে কথা হত একটু-আধটু । বুঝতে পারলাম আমাদের মধ্যে হয়তো বন্ধুত্বের একটা ভাল সম্পর্কের সৃষ্টি হয়ে গেছে । 

একদিন অহনাকে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম ,
-
আচ্ছা অহনা আমরা কি বন্ধু হয়ে গেছি ?
চোখগুলো বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো অহনা ! তারপর বললো ,
-
আচ্ছা তুমি কোন দেশের গরু আগে বল তো ? ডেনমার্ক না নিউজিল্যান্ড ?
-
আমি গরু হতে যাব কোন দুঃখে ? আমি বাংলাদেশের মানুষ
-
তোমাকে গরু বলবো না তো কি বলবো  ? এতদিনে ও বুঝতে পারলে না যে আমরা খুব ভাল বন্ধু ।
-
এত রাগ করার কি আছে , বুঝিয়ে বললেই তো হয় !
-
গরু যে তাই বুঝিয়ে বলতে হয় !

এই কথা বলে অহনা চলে গেল , আজকে তাহলে ভালোই রাগ উঠেছে মেয়েটার । একটা ব্যাপার আজও বুঝতে পারলাম না মেয়েটা আমাকে গরু ডাকে কেন ? গরুর প্রতি অহনার আকর্ষণ বেশি মনে হয় .....
পড়ালেখার ব্যাপারে ব্যাপক পরিমাণে সিরিয়াস ছিল অহনা আর আমি ছিলাম এর উল্টো ! তবে ঐ মেয়ের সংস্পর্শে এসে আমিও খানিকটা সিরিয়াস হয়েছিলাম।ভালোই লাগতো মেয়েটার সাথে মিশতে , অনেক সহজ-সরল । 

ওর যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করতো তা হল ওর কথা বলার ভঙ্গি । হাত নাড়িয়ে কেমন করে যেন কথা বলতো , আর আমি তা শোনা ও দেখা দুইটাই একমনে চালিয়ে নিয়ে যেতাম । রিকশা করে ঘুরতে অহনার খুব ভাল লাগতো । তাই মাঝে মাঝে ক্লাস শেষে দুইজন একসাথে ঘুরতে বের হতাম । একটা মেয়ে যে কত কথা বলতে পারে তা আপনি কখনোই বুঝতে পারবেন না যদি মেয়েটার সাথে না মেশেন ! তবে অহনার কথাগুলো শুনতে ভালোই লাগতো । ওর খারাপ লাগা , ভাল লাগা , ওর স্বপ্ন , ওর ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনা এসব প্রতিদিনই নতুন নতুন রূপ ফিরে পেত ওর কথার মাঝে । স্বাভাবিক ভাবেই বুঝতে পারছিলাম যে আমি ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি । তারপর ও চেয়েছিলাম এই দুর্বলতা কাটাতে , কারণ প্রেম-ভালবাসা এসবের প্রতি কখনোই কোন আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখি নি অহনাকে । অযথা , বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা !
একজন বিখ্যাত লেখক বলে গেছেন যে , একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে যত ভাল বন্ধুই হোক না কেন , একসময় তারা একে অপরের প্রেমে পড়বে ! আমার ও ঠিক তাই হয়েছিল । অনেক চেষ্টা করা সত্ত্বেও নিজেকে মানাতে পারি নি । অবশেষে বাধ্য হয়ে ঠিক করলাম যে , অহনাকে বলে দিব আমার ভালবাসার কথা .....
গত কিছুদিন ধরে শরীরটা খারাপ , কোচিং এ ও যেতে পারছি না । কিন্তু , সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে এই কয়েকদিনের মধ্যে অহনা আমাকে একবার ও ফোন দেয়নি , আমি যে কোচিং এ যাচ্ছি না এই ব্যাপারে ওর কোন খেয়ালই নেই ! হতে পারে পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত ।
 
সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন এসব ভাবছিলাম তখনই অহনার ফোন ...
-
হ্যালো !
-
রাফিন তুমি কোথায় ?
-
বাসায় ।
-
প্লিজ , কোচিং এ আসো না তোমার সাথে জরুরী কথা আছে , প্লিজ !
-
আসছি ।
তাড়াতাড়ি কোন রকমে নাস্তা খেয়ে অসুস্থ শরীরটা নিয়েই বের হলাম । ক্লাসে যে ঢুকলাম ঐদিকে অহনার কোন নজর নেই । কোচিং শেষে অহনার সাথে দেখা হল .....
-
কি ব্যাপার ! কি এমন জরুরী কথা বল তো ।
-
বলবো , বলবো অবশ্যই বলবো !
-
হুম বল ।
-
তুমি জানো আবির আমাকে প্রপোজ করেছে আর আমি একসেপ্ট করেছি । কি আশ্চর্যের ব্যাপার আমি আবিরকে পছন্দ করতাম , চেয়েছিলাম আমি আবিরকে প্রপোজ করবো অথচ আবির নিজেই করে দিল ! আবির আমাকে ভালবাসতো তা আমি জানতাম না ।
-
তুমি আবিরকে ভালবাসতে ? কবে আবির তোমাকে প্রপোজ করলো ?
-
হ্যাঁ , কোচিং এর প্রথম থেকেই আবিরকে ভাল লাগতে শুরু হয় কিন্তু কখন যে এই ভাল লাগা ভালবাসায় রূপ নিয়েছে বুঝতেই পারি নি । এক সপ্তাহ আগে আবির প্রপোজ করেছে একদম সবার সামনে । তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এতদিন বলি নি ।
-
সত্যিই অনেক বড় সারপ্রাইজ পেয়েছি অহনা !
 
আমাদের কথার মাঝখানেই আবির এসে অহনাকে নিয়ে যায় । আসলেই জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ পেলাম আজকে ....
কিছু বলার আগেই সব এভাবে শেষ হয়ে যাবে তা কখনো কল্পনা ও করি নি । আসলে মানুষ যা কল্পনা করে না , তা ই তার সাথে ঘটে ! যত চেষ্টাই করি না কেন অহনা কে আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না , এটা আমি ভালো করেই জানি । প্রথম ভালবাসা কোনদিন ভুলে থাকা যায় না । যখন অহনার কথা মনে হয় তখন কেন জানি অজান্তেই চোখটা ভিজে উঠে । সবকিছুর পর ও এই ভেবে আমি সুখী যে অহনা সুখে আছে এবং থাকবে । আবির যথেষ্ট ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে , সবার ভাষ্যমতেও আবির অনেক ভাল একটা ছেলে । ব্রিলিয়ান্ট আর ব্রিলিয়ান্টে জুটি হয়েছে , একদম পারফেক্ট একটা জুটি !
 
ভর্তি পরীক্ষার আর একমাস বাকি । এখন আর অহনার সাথে আগের মত যোগাযোগ হয় না । অহনা ও ফোন দেয় না , আমিও না । বোঝা ই যাচ্ছে অহনা অনেক সুখে আছে । সুখে থাকলে বুঝি মানুষ সবকিছুই ভুলে যেতে পারে ! আর আমি তো অহনার কাছে কিছুই না । যোগাযোগ না হওয়াই ভাল , দূরে থাকলে মায়া কম থাকে । আর মায়ার বাঁধন বড় শক্ত বাঁধন সুতরাং এ মায়া না থাকাই ভাল ।
বেশ কিছুদিন ধরে পড়ালেখায় মনযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছি । যেভাবেই হোক একটা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স তো পেতে হবে । পুরো পরিবারের আশা তো এভাবে আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারি না । পুরোপুরি মনযোগ হয়তো দিতে পারি না তবে চেষ্টা করে যাচ্ছিআমাকে যে পারতেই হবে .....
অবশেষে এডমিশন টেস্ট শেষ হল । নিজেকে আজ অনেক মুক্ত লাগছে । ভেবে ভাল লাগছে যে , আমার পরিশ্রম বৃথা যায় নি ! ঢাকায় কোথাও চান্স না হলে রাজশাহী ভার্সিটিতে চান্সটা হয়ে গেল । বাসায় সবাই ও খুশি !
অহনা আর আবিরের খোঁজটা নেওয়া দরকার । অহনা কে ফোন দেয়ার সুযোগ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে । ওদের রিলেশন শুরু হওয়ার দুইমাস পর আবির অহনা কে নিষেধ করে যেন সে আমার সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ না রাখে ! অহনা ও শেষমেশ আমাকে মেসেজ করে নিষেধ করে দেয় যেন আমি কখনোই ওর সাথে যোগাযোগ করার কোন প্রকার চেষ্টা না করি।এর পর থেকেই আমাদের মধ্যে সকাল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন । 

আবির যে অহনা কে নিষেধ করেছিল তা অহনা আমাকে বলে নি , পরে আমি তা জানতে পারি অহনার এক বান্ধবীর মাধ্যমে ।
 
কিছুদিন পর ....
অনেক চেষ্টার পর আবির আর অহনার খবর জানতে পারলাম । দুইজনের একজন ও কোথাও চান্স পায় নি । অহনা একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে আর আবির চেষ্টা করছে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার । এই খবরে তো আশ্চর্য হয়েছি ই সাথে সাথে আরেকটা খবরে বেশ মন খারাপ হল ! ইদানিং না কি আবির আর অহনার মধ্যে বেশ ঝগড়া চলছে । এরকম কিছু হবে তা কখনোই আশা করি নি । যতবার নামায পড়ি ততবারই আল্লাহর কাছে এটাই চাই যে ওদের মধ্যে যত সমস্যা আছে সব যেন ঠিক হয়ে যায় । ওরা যেন সবসময় ভাল থাকে , সুখে থাকে .....

টানা ছয় মাস পড়ালেখার পর্ব শেষে ঈদের ছুটিতে বাসায় আসলাম । অনেক দিন পর সব বন্ধুদের সাথে দেখা । বেশ আনন্দেই কাটছিলো সময়গুলো । সেদিন হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেল অহনার বান্ধবী দিশার সাথে । আমি অবশ্য কখনোই চিনতাম না যদি ও ডাক না দিতো .....
-
এই রাফিন !
-
তুমি ?
-
দিশা , চিনতে পেরেছো ?
-
হ্যাঁ দিশা ! কেমন আছো ?
-
এইতো ভাল , সবাইকে দেখি ভুলে গেছো ?
-
আরেহ না , ভুলি নি । আসলে অনেকদিন ধরে দেখা হয় না তো ।
-
তুমি কেমন আছো ?
-
এইতো আছি একরকম ।
-
পড়ালেখার কি অবস্থা ?
-
হুম চলছে ভালোই । তোমার কি খবর ?
-
এইতো বেশ আছি !
-
দিশা , অহনা কেমন আছে ?
-
থাক রাফিন , ওর কথা না শোনাই তোমার জন্য ভাল ।
-
কেন ? কি হয়েছে ?
-
মেয়েটার সাথে কি হয়নি সেটা জিজ্ঞেস কর ! প্রথমে তো ভার্সিটিতে চান্স পেল না । তারপর আবির ওকে ছেড়ে চলে যায় । দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর ও অহনার সাথে কোন যোগযোগ করে নি । শুধু একটা মেইল করেছিল এবং বলেছে ওকে ভুলে যেতে । একটা বন্ধুও এখন ওর পাশে নেই । সম্পূর্ণ একটা হয়ে গেছে মেয়েটা । এখনের অহনা আর আগের অহনা নেই রাফিন । একদম বদলে গেছে ।
-
হুম ...
-
আচ্ছা রাফিন তুমি না অহনাকে ভালবাসতে ?
-
হুম !
-
এখনো ভালবাসো ?
-
হ্যাঁ ।
-
তো বসে আছো কেন ? অহনাকে বলছো না কেন তোমার ভালবাসার কথা । হয়তো তোমার হাত ধরেই ও ওর নতুন জীবনটা শুরু করতে পারবে । প্লিজ রাফিন !
-
আমি অহনার সাথে দেখা করবো ।
-
আচ্ছা ঠিক আছে । আমি তোমাদের দেখা করিয়ে দিব । কোথায় দেখা করবে আমি সব ঠিক করে তোমাকে জানাবো । এবার আর কোন ভুল কর না রাফিন ।
-
না , এবার আর কোন ভুল নয় ।
-
তুমি পারবে ! আচ্ছা আমি এখন চললাম । তোমার নাম্বার আমার কাছে আছে । আমি সব জানাবো সময়মত ।
-
ওকে , আবার দেখা হবে ।
কি থেকে কি হয়ে গেল ? মাথায় কিছুই কাজ করছে না .....
.
অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি । অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হল , দিশা আর অহনা আসলো । তোমরা কথা বল , এই কথা বলে দিশা সরে গেল .....
-
ভাল আছো , অহনা ?
-
হ্যাঁ , তুমি ?
-
মিথ্যা বলছো কেন ? আমি জানি তুমি ভাল নেই ।
-
আরেহ না , ভাল আছি তো ।
-
আমি সব জানি । আবির তোমার সাথে এরকম করবে তা আমি কখনো স্বপ্নে ও কল্পনা করি নি !
-
তাহলে তো দেখছি সব জেনেই গেছো ।
-
দিশা যদি না বলতো তাহলে কখনোই জানতাম না ! কোন দিন তো যোগাযোগ ও করো নি
-
কোন মুখ নিয়ে যোগাযোগ করতাম ? যে মুখ দিয়ে তোমার মত ভাল বন্ধুকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম ?
-
আমি কিন্তু দূরে সরে যাই নি , তোমার পাশেই ছিলাম । কিন্তু , এখন শুধু বন্ধু হয়ে নয় আরো বেশি কিছু হয়ে তোমার পাশে থাকতে চাই !
-
মানে ?
-
আমি তোমাকে ভালবাসি , অহনা !
-
করুণা দেখাচ্ছো ?
-
যদি করুণা দেখাতে হত তাহলে এতদিন ধরে ভালবেসে আসতাম না ।
-
কি ?
-
আমি তোমাকে অনেক আগে থেকেই ভালবাসি । একদম কোচিং এর শুরু থেকেই । কিন্তু তা আর বলার সুযোগ পাই নি । এখন সুযোগ পেয়েও আমি আবার তোমাকে হারাতে চাই না । প্লিজ , অহনা !
-
আমার ভয় করে যদি আবার কষ্ট পেতে হয় ?
-
আমাকে বিশ্বাস করতে পার , কোনদিন কষ্ট পাবে না । হাতে হাত রাখবে ?
-
হাতটা তো আগে বাড়াবে !
এই কথা বলে হাসতে শুরু করলো অহনা । আমিও অহনার হাতটা শক্ত করে ধরলাম , আর কোনদিন ছাড়বো না এই হাত