ভূমিকা: পবিত্র কুরআন এমন এক ঐশী গ্রন্থ, যা যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে পথনির্দেশনা দিয়ে আসছে। এর আয়াতগুলোতে এমন অনেক জ্ঞান নিহিত আছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান বহু শতাব্দি পর উন্মোচন করছে। আমরা এর আগে দেখেছি, কীভাবে সূরা আল-মাআরিজ-এর একটি আয়াত (৭০:৪) আলোর গতি এবং টাইম ডিলেশনের বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। আজকের লেখায় আমরা কুরআনের আরও একটি বিখ্যাত ঘটনা, "আসহাবে কাহাফ" বা গুহাবাসীদের দীর্ঘ ঘুম, নিয়ে আলোচনা করব। তারা ৩০৯ বছর ঘুমিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের নিজেদের কাছে মনে হয়েছিল মাত্র একদিন বা দিনের কিছু অংশ। এই অলৌকিক ঘটনা কি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের "টাইম ডিলেশন" দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? আসুন, গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।
আসহাবে কাহাফের ঘটনা: একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ
পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা কাহফ-এ আসহাবে কাহাফের ঘটনা বর্ণিত আছে। এটি একদল যুবককে নিয়ে যারা তৎকালীন অত্যাচারী রাজার নির্যাতন থেকে নিজেদের ঈমান রক্ষায় একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে তারা সেই গুহায় দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমিয়ে ছিলেন। যখন তারা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন, তাদের মনে হয়েছিল তারা মাত্র একদিন বা দিনের কিছু অংশ ঘুমিয়েছেন। কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে কেটে গিয়েছিল প্রায় ৩০৯ বছর! (সূরা কাহফ, ১৮:১৯ ও ১৮:২৫)।
টাইম ডিলেশন কী? একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) অনুযায়ী, সময় একটি স্থির বিষয় নয়; এটি আপেক্ষিক এবং বস্তুর গতির উপর নির্ভরশীল। যখন কোনো বস্তু আলোর গতির (c ≈ 299,792,458 মিটার/সেকেন্ড) খুব কাছাকাছি চলে, তখন সেই বস্তুর জন্য সময় বাইরের একজন স্থির পর্যবেক্ষকের তুলনায় অনেক ধীরে প্রবাহিত হয়। একেই টাইম ডিলেশন বা সময় প্রসারণ বলা হয়।
আমাদের পূর্বের গবেষণায়, সূরা আল-মাআরিজ (৭০:৪) এর আয়াতের উপর ভিত্তি করে আমরা দেখেছি যে, যদি একজন সত্তার জন্য ১ দিন কেটে যায় এবং বাইরের পর্যবেক্ষকের জন্য ৫০,০০০ বছর কেটে যায়, তাহলে সেই সত্তাকে প্রায় আলোর গতিতে চলতে হয়। এই হিসাবটি বিজ্ঞান ও কুরআনের এক অভূতপূর্ব মিলকে তুলে ধরে।
গাণিতিক বিশ্লেষণ: আসহাবে কাহাফের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গতি
এখন প্রশ্ন হলো, আসহাবে কাহাফের ক্ষেত্রে কি একই ধরনের টাইম ডিলেশন প্রযোজ্য? অর্থাৎ, গুহার ভেতরে ১ দিনের ঘুম বাইরের ৩০৯ বছরের সমান হতে হলে, গুহার আপেক্ষিক গতি কত হতে হবে?
আমরা টাইম ডিলেশনের মূল সূত্রটি ব্যবহার করব:
t = t0 / (1 - v^2/c^2)^0.5
এখানে:
t: বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে অতিক্রান্ত সময় (যেমন, পৃথিবীর হিসাবে ৩০৯ বছর)।
t0: চলমান বস্তু বা ভ্রমণকারীর কাছে অতিক্রান্ত সময় (যেমন, গুহাবাসীদের কাছে ১ দিন)।
v: প্রয়োজনীয় আপেক্ষিক গতি (যা আমরা বের করতে চাই)।
c: আলোর গতি (প্রায় 299,792,458 m/s)।
ধাপ ১: সময়কে একই এককে (সেকেন্ডে) রূপান্তর
গণনার সুবিধার জন্য, আমাদের t এবং t0 কে একই এককে, যেমন সেকেন্ডে রূপান্তর করতে হবে।
t0 (গুহাবাসীদের সময়): 1 দিন = 24 ঘণ্টা 1 ঘণ্টা = 3600 সেকেন্ড সুতরাং, t0 = 1 দিন * 24 ঘণ্টা/দিন * 3600 সেকেন্ড/ঘণ্টা = 86,400 সেকেন্ড
t (বাইরের পৃথিবীর সময়): আমরা সরলতার জন্য 1 বছর = 365 দিন ধরে নিচ্ছি (লিপ ইয়ারের সামান্য পার্থক্য এক্ষেত্রে নগণ্য)। t = 309 বছর * 365 দিন/বছর * 24 ঘণ্টা/দিন * 3600 সেকেন্ড/ঘণ্টা t = 9,742,761,600 সেকেন্ড
ধাপ ২: সূত্রের সাহায্যে 'v' এর মান বের করা
এবার আমাদের লক্ষ্য হলো 'v' কে সূত্র থেকে আলাদা করা। সূত্রটিকে ধাপে ধাপে সমাধান করি:
১. t / t0 = 1 / (1 - v^2/c^2)^0.5
২. উভয় পক্ষকে বর্গ করি:
(t / t0)^2 = 1 / (1 - v^2/c^2)
৩. সমীকরণটিকে উল্টাই (ব্যস্তকরণ করি):
1 - v^2/c^2 = 1 / (t / t0)^2
৪. v^2/c^2 কে একদিকে নিয়ে আসি:
v^2/c^2 = 1 - 1 / (t / t0)^2
৫. v^2 বের করি:
v^2 = c^2 * (1 - 1 / (t / t0)^2)
৬. v বের করার জন্য বর্গমূল করি (বা 0.5 ঘাত ব্যবহার করি):
v = c * (1 - 1 / (t / t0)^2)^0.5
ধাপ ৩: মান বসিয়ে গণনা
এখন আমরা t এবং t0 এর সেকেন্ডের মানগুলো বসাবো:
প্রথমে t / t0 অনুপাতটি বের করি:
t / t0 = 9,742,761,600 সেকেন্ড / 86,400 সেকেন্ড approx 112,763.44
এবার এই মানটিকে v এর সূত্রে বসাই:
v = c * (1 - 1 / (112,763.44)^2)^0.5
v = c * (1 - 1 / 12,715,699,531.36)^0.5
v = c * (1 - 0.00000000007864)^0.5 (লক্ষ্য করুন, 1 এর থেকে বিয়োগ হওয়া সংখ্যাটি খুবই ছোট)
v = c * (0.99999999992136)^0.5
v = c * 0.99999999996068
সবশেষে, c এর মান (299,792,458 m/s) দিয়ে গুণ করলে:
v approx 299,792,458 m/s * 0.99999999996068
v approx 299,792,457.999988 m/s
ফলাফল:
এই হিসাব থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যদি ১ দিনের ঘুমকে ৩০৯ বছরের সমান হতে হয় (টাইম ডিলেশনের মাধ্যমে), তাহলে গুহার অভ্যন্তরের পরিবেশকে আলোর গতির প্রায় 99.999999996% গতিতে বা সেই সমতুল্য আপেক্ষিকতায় চলতে হতো। এটি আলোর গতির অত্যন্ত কাছাকাছি একটি সংখ্যা।
উপসংহার: অলৌকিকতা না বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা?
আমাদের এই গাণিতিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি যদি শুধুমাত্র আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের টাইম ডিলেশন দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে গুহার ভেতরে এমন চরম ও অস্বাভাবিক গতি বা পরিবেশের প্রয়োজন যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অসম্ভব। গুহাবাসীরা স্থির অবস্থায় ছিলেন, এবং পৃথিবীর গতি এত বেশি নয় যে এমন বিশাল টাইম ডিলেশন ঘটাতে পারে।
অতএব, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি একটি মৌকিক বা অলৌকিক (Miraculous) ঘটনা। এটি আল্লাহর সরাসরি কুদরত (ক্ষমতা) দ্বারা ঘটেছে, যা প্রাকৃতিক নিয়মাবলীর বাইরে। আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি তাঁর ইচ্ছায় যেকোনো নিয়মকে পরিবর্তন করতে পারেন। এই ঘটনা মানুষকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, ঈমানের দৃঢ়তা এবং পুনরুত্থানের ক্ষমতা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়।
কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে যা বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে দারুণভাবে মিলে যায় (যেমন সূরা মাআরিজ)। আবার এমন কিছু ঘটনাও আছে যা সম্পূর্ণরূপে অলৌকিক এবং আমাদের সীমিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এই উভয় দিকই কুরআনের সর্বজনীনতা এবং আল্লাহর ক্ষমতার বিশালতাকে তুলে ধরে। এটি বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে কোনো সংঘাত নয়, বরং উপলব্ধির এক ভিন্ন দিগন্ত উন্মোচন করে।
No comments:
Post a Comment